Trending

Monday, 17 June 2019

কাশীপুর রাজবাড়ির ইতিকথা



















আজকের পর্বে আমরা জেনে নেব পুরুলিয়ার বিখ্যাত কাশীপুর রাজবাড়ির কিছু অজানা কথা। মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী ধান নগর ,ঝালদা পাড়া, গড় পঞ্চকোট, মহারাজ নগর ,গ্রাম বনি ইত্যাদি জনপদ ক্রমে সরতে সরতে পঞ্চকোট রাজবংশের শেষ রাজধানী হয় কাশিপুর। কাশিপুর শুধুমাত্র ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয় ,এটি অত্যন্ত সংস্কৃতিমনস্ক একটি স্থান। রাজারা সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। রাজদরবারে বিভিন্ন প্রান্তের পণ্ডিতদের নিয়ে রীতিমতন নবরত্ন সভা বসত। যদিও সেসব কিছুই এখন কালের অতলে হারিয়ে গেছে।
1832 থেকে 1914 সালের মধ্যে এ রাজবাড়ির বিরাট পরিবর্তন হয়। রাজা নীলমণি সিংহ দেও এবং তার সুযোগ্য পুত্র জ্যোতি প্রসাদ সিং দেও এর হাত ধরে কাশিপুর রাজবাড়ি এক অনন্ত কৃতিত্বের নিদর্শন হয়ে দাঁড়ায়। সে সময় রাজবাড়ীর দরবার থেকে ভেসে আসত ঝুমুর, ভাদু সহ বিষ্ণুপুরের উচ্চ ঘরানার বিভিন্ন শাস্ত্রীয় সংগীত। মৃদঙ্গের বোল আর বাঁশির মিঠে সুরে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে থাকতো।


ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী 1832 সালে পুরার কেশরগড় থেকে পঞ্চকোট রাজ কাশীপুরে তাদের রাজধানী স্থাপন করেন। এবং সে বংশে মোট সাতজন রাজা থাকলেও বিশেষ করে যে দুজনের নাম উঠে আসে। তারা হলেন নীলমণি সিংহ দেও এবং তার পুত্র জ্যোতি প্রসাদ সিংহ দেও।তৎকালীন মানভূমে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে তারা নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিলেন। নীলমণি সিংহ দেও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। সিপাহী বিদ্রোহের সময় তার নেতৃত্বেই পুরুলিয়া ট্রেজারি লুট হয়েছিল। পুরুলিয়া জেলা আন্দোলনের নেতা ছিলেন তিনি। তার বিদ্রোহের কাছে ভীত হয়ে ইংরেজরা পুরুলিয়া থেকে রঘুনাথপুর হয়ে রানীগঞ্জে পালিয়ে ছিলেন।


প্রায় তিন মাস পুরুলিয়া ব্রিটিশ শাসন মুক্ত ছিল।পরে অবশ্য ইংরেজরা নীলমণি সিংহ কে আটক করেন এবং কাশিমবাজারের রানী স্বর্ণময়ী 44 মৌজার বিনিময় তাকে জামিনে মুক্ত করেন।1872 সালে মধুসূদন দত্ত বেশ কিছুদিন কাশিপুর রাজবাড়ি তে ছিলেন। রাজা জ্যোতি প্রসাদের আমলেও এ রাজবাড়ীতে বেশ কয়েকজন গুণী মানুষের পদধূলী পড়েছিল। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষক যদু ভট্ট, ঝুমুরিয়া ভবানন্দও নর্তকী সিন্ধু বালা দেবী। রাজা জ্যোতি প্রসাদ পঞ্চকোট প্রকাশনা থেকে চার খণ্ডে "বৃহৎ রসমঞ্জুরী" প্রকাশ করেছিলেন। রাখাল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের "পঞ্চকোট ইতিহাস "ও তার ই প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়।
এছাড়া তিনি নিজ ব্যয়ে দাতব্য চিকিতসালয় ,ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। পুরুলিয়া লেডি ডাফরিন হাসপাতাল, কুষ্ঠ চিকিৎসালয়, পশু চিকিৎসালয় ইত্যাদি তিনি নির্মাণ করেন।


তার আমলেই ধানবাদ আসানসোল এলাকায় মাটির নিচ থেকে কয়লা বের হওয়ায় তার রয়ালিটি পান জ্যোতি প্রসাদ। সেই টাকায় তিনি তার রাজ্যকে এবং কাশিপুর রাজবাড়ি কে অত্যন্ত সুন্দরভাবে সজ্জিত করেন। হাজার 1916 সালে চীন থেকে রাজ মিস্ত্রী এনে টানা 12 বছরের চেষ্টায় কাশীপুরে সুদৃশ্য রাজবাড়ী তিনি নির্মাণ করেন। রাজবাড়ীতে দুর্গাপুজো রাস উৎসব ,দোল উৎসব সহ বিভিন্ন উৎসব মহা ধুমধাম করে পালন করা হতো।এই রাজ বাড়ির সাথে নজরুল ইসলামের ও যোগাযোগ ছিল। 


রাজাদের ঐশ্বর্য বৈভবের পরিচয় বহন করছে সুবৃহৎ ঝাড়লন্ঠন, বিভিন্ন পাথরের মূর্তি ,বেলজিয়াম কাচের আয়না এবং আরো অন্যান্য জিনিসপত্র।তবে কাশিপুর রাজবাড়ি সারাবছর দর্শকদের জন্য খোলা থাকে না। কারণ এখানে এখনো রাজার বংশধরেরা বাস করেন। শুধুমাত্র দুর্গাপূজার সময় রাজবাড়ীকে জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় তাই কাশিপুর রাজবাড়ি দেখতে হলে দুর্গাপূজার সময় গিয়েই আপনাকে দেখে আসতে হবে।


No comments:

Post a Comment