Trending

Monday, 24 June 2019

যখন নদী হাতছানি দেয়





ঘুরতে যেতে কে না ভালোবাসে। কিন্তু ঘুরতে যাওয়ার জন্য সময় আর অর্থ দুটোই তো দরকার। অথচ অজানা আকর্ষণে বেরিয়ে পড়ার ইচ্ছা মনের মধ্যে থেকেই যায়। সেই কারণেই আমরা খুঁজে খুঁজে বের করি এমন কিছু গন্তব্যকে ,যেগুলো আমাদের অজানাকে জানার আকাঙ্খার পরিতৃপ্তি ঘটায় আর এক নতুন জায়গা দর্শন ও হয়ে যায়। আসলে আমরা বরাবরই দূর কে ভালবাসি। কিন্তু আমাদের হাতের কাছে যা আছে, যা আমাদের রোজকার জীবনে চোখে পড়ে, সেই জিনিস গুলো কে আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখি না। সেরকমই কিছু জায়গা আছে আমাদের হাতের কাছে। যেখান দিয়ে আমরা হয়তো রোজ যাওয়া  আসা করি। কিন্তু সেই জায়গাটি সম্পর্কে বিশেষভাবে কিছু জানি না। এবং সে জায়গাটির সৌন্দর্য উপলব্ধি করার চেষ্টাও করি না ।আমরা শুধু ছুটে যেতে চাই দূরে হাতছানিতে।
সে কারণেই আজ আমরা আলোচনা করব কলকাতার খুব কাছে থাকা একটি জমিদার বাড়ির সম্পর্কে। গোবরডাঙ্গার নাম তো সবাই শুনেছি কিন্তু গোবরডাঙ্গাতে ও যে এমন সুন্দর একটি দর্শনীয় জায়গা আছে সেটা কজন জানি বলুন তো?



ইছামতি সত‍্যিই ইচ্ছেমতি। তার ছেড়ে যাওয়া বাকটিকে বর্তমানে বেরি বাওর বলা হয়। অত্যন্ত মনমুগ্ধকর এই জায়গাটা আপনার মন প্রান সজীব করার জন্য একদম আদর্শ। এবেরি বাওর সত্যিই এক অতি মনোহর স্থান এবং ভৌগোলিক হিসেবে এটি পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ। এই বেরি বাউরে আসলে আপনি অবশ্যই দর্শন করবেন এখানে অবস্থিত রামকৃষ্ণ মঠটিকে। এই রামকৃষ্ণ মঠটি কিন্তু বিবেকানন্দ অথবা রামকৃষ্ণ মঠ কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় নির্মিত হয়নি। বেরি হাই স্কুলের এক শিক্ষক রামকৃষ্ণ দেবের পূজা করতেন এবং রামকৃষ্ণ দেব কে তিনি অত্যন্ত কাছের মানুষ বলে মনে করতেন। তার মৃত্যুর পর তার ছাত্ররা এখানে এই রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা করে ,যা আজকে একটি বিশাল বিল্ডিং নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আশ্রমের শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ আপনার মনকে মুগ্ধ করে দেবে। আশ্রম টি খোলা থাকে সকাল 12 টা পর্যন্ত এবং আবার বিকেল সাড়ে তিনটের পর আশ্রমটি খোলা হয়। এই সময়সীমা অনুযায়ী যদি আপনি আশ্রম এ আসেন তাহলে আপনি আশ্রম এর ভিতরে প্রবেশ করতে পারবেন এবং ঠাকুরের দর্শন করতে পারবেন। তবে সময়সীমা অনুযায়ী না এলে যে আশ্রমের মূল ফটক আপনার জন্য বন্ধ থাকবে তা নয়। আপনি আশ্রম প্রাঙ্গন পরিভ্রমণ করতেই পারেন এবং তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।



বেরি বাওর দর্শন করার পর আপনি চলে আসতে পারেন গোবরডাঙ্গা স্টেশন এর নিকটবর্তী চন্ডীতলা ঘাটে। এখানে রয়েছে জোড়া শিব মন্দির। এই মন্দিরের একটি ইতিহাস আছে।
আমরা সবাই জানি হিন্দু নারীদের বৈধব্য জ্বালা থেকে মুক্তি দেবার জন্য  1856 সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়ন করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন সমাজে আইন প্রণয়ন করলেই তো হলো না। সে আইন কে বাস্তবে রূপদান করা সত্যিই খুব কঠিন ব্যাপার ছিল। তবুও বিদ্যাসাগর এর অনুপ্রেরণায় গোবরডাঙ্গার কৃতি সন্তান শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রথম বিধবা বিবাহ টি করেছিলেন। কলকাতার 12 নম্বর সুকিয়া স্ট্রিটে এই বিবাহ কাজ সম্পন্ন হয়েছিল এবং ঈশ্বর চন্দ্র মহাশয় নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এ বিবাহের তত্ত্বাবধান করেছিলেন। কিন্তু বিবাহ করলেও সমাজ এ বিবাহ কে মেনে নেয় নি। তৎকালীন সময়ে বড় বড় কাগজপত্রে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন এর  নামে অনেক অকথা কুকথা লেখা হতো। উঠতে বসতে নিজের কাছের মানুষ তথা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছ থেকে তাকে অনেক কটু বাক্য শুনতে হয়েছে। অবশেষে তার মায়ের মৃত্যুর পর  তিনি গোবরডাঙ্গার ফিরে আসেন এবং চন্ডীতলা ঘাটে এসে নির্মাণ করেন এই জোড়া শিবমন্দির।


জোড়া শিব মন্দির দর্শন এর পর আপনি চলে আসতে পারেন গোবর ডাঙ্গা জমিদার বাড়িতে যেখানে অনেক ইতিহাস আজ লুকিয়ে আছে। এই বড় তরফের জমিদার বাড়ির সন্তান নয়ন প্রসন্ন মুখার্জি আজও জীবিত। এ জমিদার বাড়ির ইতিহাস সম্পর্কে হয়তো তিনি নিজেই আপনাকে জানাতে পারেন। তবে আপনাদের সুবিধার্থে ইতিহাস আমি এখানে কিছুটা উল্লেখ করে রাখছি। জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শ্যামলাল মুখোপাধ্যায়। একবার তিনি নদীপথে কালীঘাট যান মায়ের পুজো দিতে এবং পুজো সেরে ফেরার পথে ইছাপুরের চৌধুরী পরিবারের সঙ্গে তার আলাপ হয়। এই চৌধুরী পরিবার জমিদার বংশ ছিলেন এবং ব্রাহ্মণ ছিলেন। এরপর সেই পরিবারের সঙ্গে শ্যামলাল মুখোপাধ্যায়ের একটি পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি হয়। ‌ শ্যামলাল মুখোপাধ্যায়ের দুটি সন্তান। বড়ো ছেলে ভালো হলেও ছোট ছেলেটি ছিল অত্যন্ত দুষ্ট। সেই ছোট ছেলে 10 বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে নৌকা যোগে ইছাপুরে চলে যায় তার মামার বাড়িতে। সেখানে দাদুর আদরে সে দিন যাপন করতে থাকে এবং বড় হবার পর আবার ফিরে আসে নিজের বাড়িতে এমনই নানা কথা জানা যায় জমিদার বাড়ির বর্তমান সন্তানের মুখে। সেই সময়কার জমিদারদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ,তাদের চালচলন ,আচার-আচরণ এ সমস্ত কিছুর আভাস পেতে হলে আপনাকে একবার জমিদারবাড়ি দর্শন করতেই হবে। আর জমিদার বাড়ির অন্দরমহল নিজের পুরনো ঐতিহ্য আঁকড়ে বসে আছে আপনার অপেক্ষায়।
জমিদার বাড়ি দর্শন শেষ করে চলে আসতে পারেন উল্টোদিকে মা প্রসন্নময়ী মন্দিরে। এখানে চারপাশে বেষ্টন করে আছে 12 টি শিব মন্দির। ঠিক তার মাঝখানে রয়েছে মা প্রসন্নময়ী কালী মন্দির। মন্দিরের আধ্যাত্মিকতা আপনার মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।


এবারে আমরা আসি কলকাতা থেকে কিভাবে আপনি এই মনোরম স্থান ভ্রমণ করতে পারবেন। সড়ক পথে বাইক অথবা গাড়ি করে আপনি আসতে পারেন। আর যদি রেলপথে আসতে চান তাহলে আপনাকে শিয়ালদা থেকে বনগাঁ গামী যে কোন লোকাল ট্রেন ধরতে হবে। নামতে হবে গোবরডাঙ্গা স্টেশনে। গোবরডাঙা স্টেশন থেকে শুরু হবে আপনার গন্তব্য। সেখান থেকে টোটো ভাড়া করে আপনি চলে আসতে পারেন জমিদার বাড়ি। দেখে নিতে পারেন মা প্রসন্নময়ী কালী মন্দির এবং তারপর চলে আসুন পাঁচপোতা র উদ্দেশ্যে। গোবরডাঙ্গা থেকে পাঁচপোতা দূরত্ব 11 কিলোমিটার ।আপনি টোটোতে  পাড়ি দিতে পারেন । এখানেই রয়েছে বেরি বাওর এর বিখ্যাত অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ। তাহলে আর দেরি কিসের? কোন একটা ছুটির দিন ঘুরে আসুন হাতের কাছে লুকিয়ে থাকা মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই স্থান থেকে।


No comments:

Post a Comment