Trending

Tuesday, 25 June 2019

ইতিহাসে ষড়যন্ত্র আর রহস্যময়তার মিশেল কাঠগোলা বাগান



মুর্শিদাবাদ মানে ইতিহাস। মুর্শিদাবাদের প্রতিটি পরতে পরতে মোড়া ইতিহাসের অজস্র কাহিনী আজ  আমাদের বিস্মিত এবং আশ্চর্য করে। হাতের কাছে থাকা এই প্রাচীন জনপদটির নবাবী আমলের রাজধানী ছিল। আর সেই কারণেই এখনো তার মধ্যে রাজ ঐশ্বর্যের ছোঁয়া লেগে রয়েছে। সেরকমই একটি বৈভব পূর্ণ স্থান আজ আমরা পরিভ্রমণ করতে চলেছি ,সেটি হল মুর্শিদাবাদের কাঠগোলা বাগান।



লক্ষীপৎ,জনপৎ,মহীপৎএবং ধনপৎ নামের চার ভাই নির্মাণ করেছিলেন এই সুবৃহৎ কাঠগোলা বাগান। বাগানে ঢোকার মুখে একটি বিশাল নহবত গেট, আর তার পূর্ব পশ্চিমে যে রাস্তাটি গেছে সেখানে এক সময় ছিল প্রচুর কাঠের গোলা। কথিত আছে একসময় দুগার পরিবারের জৈন মতাবলম্বী এই চার ভাই জগৎশেঠের সহযোগিতায় তৎকালীন নবাবের কাছ থেকে বারোশো টাকায় 32 বিঘায় এই বাগানটা কিনে নেন। এরপর তাদের দখলে চলে আসে আড়াই হাজার বিঘা সম্পত্তি। আজও কাঠগোলা বাগান এ প্রবেশ করার পর আম বাগানের ভিতর আপনি চার ভাইয়ের বিশাল মূর্তি দেখতে পাবেন ঘোড়ায় চড়া অবস্থায়। হাজারদুয়ারি থেকে মাত্র 4 কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এটি। মূলত 1780 সালে লক্ষী পদ সিং দুগরই কাঠগোলা বাগান নির্মাণ সূচনা করেছিলেন। প্রায় আড়াইশো বিঘা জায়গা নিয়ে নির্মাণ করা হয় এই বিশাল অট্টালিকা টি, আর এর সামনে খনন করা হয় একটি বিশাল পুকুর। যেখানে আবার রাখা থাকতো বিভিন্ন ধরনের রঙিন সৌখিন মাছ। জানা যায় নবাব সৈয়দ হাসান আলী মির্জা কাঠগোলা বাগানের নাচ মহলে নিজে অংশগ্রহণ করতেন।




এই সুবৃহৎ অট্টালিকা ছাড়া এখানে রয়েছে একটি জৈন মন্দির ।এছাড়াও রয়েছে হেরেম, চিড়িয়াখানা এবং শ্বেত পাথর দিয়ে বাঁধানো একটি পুকুর। আর ঐশ্বর্য বৈভবের চিহ্ন হিসেবে বিভিন্ন মহামূল্যবান তৈজসপত্র , আসবাবপত্র এই গুলোর কথা তো বলাই বাহুল্য। এখানে গ্রিক ভাস্কর্য এর অনুকরণে অনেক মূর্তি দেখা যায় ।আর কাঠগোলা প্যালেস এর সংগ্রহশালাটি তো অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। লক্ষ্মীপুর সিং দুগার এর  সুদৃশ্য খাট ,বিশাল বড় আয়না, বিলিয়ার্ড বোর্ড, খাবার টেবিল, পোশাক রাখার আলমারি, ঝাড়বাতি, গ্যাস বাতি, তৈলচিত্র এবং একটি লাইব্রেরী।


তবে এই প্রাসাদটি যে শুরু থেকেই এমন ছিল তা নয় ।এই প্রাসাদটি পলাশীর যুদ্ধের পরবর্তী সময় থেকে অনেকগুলো বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল। তারপর 1780 সালে লক্ষ্মীপুর সিং দুগার আবার এটিকে ঠিক ভাবে নির্মান করেন। এখন ঐ কাঠগোলা প্রাসাদ টি দেখাশোনা করেন লক্ষীপৎ সিং দুগার এর বংশধর সিদ্ধার্ত এবং সঞ্জয় সিং। কাঠগোলা বাগান কে ঘিরে অনেক গল্প কথা প্রচলিত আছে ।তার মধ্যে একটি হলো এই কাঠগোলা বাগান এর পূর্ব দিকে একটি প্রাচীন মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থান আছে ।আর তার কাছে একটি ইঁদারা থেকে দুগার পরিবার প্রচুর গুপ্তধন লাভ করে। সে গুপ্তধন লাভের টাকাতেই তারা কাঠগোলা বাগান এবং মন্দির কে সুন্দর ভাবে নির্মান করেন। তবে অনেকে আবার বলেন এই চার ভাই আসলে লুঠেরা ছিল। বিভিন্ন জায়গা থেকে ধন-সম্পত্তির লুট করা ছাড়াও এদের মূল কাজ ছিল দুর্মূল্য গাছ কেটে পাচার করা। এই পরিবারের সঙ্গে বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল জগৎশেঠের পরিবারের।


সেই সময় কাঠগোলা বাগানে নিয়মিতভাবে জলসা হত, এবং সেখানে বহু লোকের সমাগম হতো। তবে বর্তমানে কাঠগোলা বাগান পর্যটকদের কাছে অতি প্রিয় একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিগণিত হয়েছে ।আর হবে নাই বা কেন এই বাগানের সৌন্দর্য প্রাসাদের ভাস্কর্য সমস্ত কিছুই তো পরিচয় দেয় ঐতিহাসিক এবং শৈল্পিক মনোভাবের। এ কাঠগোলা বাগান এ বিশাল অট্টালিকাটি ছাড়াও আর যা যা দর্শন করা জিনিস আছে সেগুলি হল সংগ্রহশালা ,আদিনাথ মন্দির, গোপন সুরঙ্গ পথ ,শ্বেত পাথরে বাঁধানো পুকুর।


কাঠগোলা প্যালেস এর অন্যতম দর্শনীয় স্থান এই আদিনাথ মন্দির।  1873 সালে হরেক চাঁদ এর মাধ্যমে লক্ষিপৎ সিং দুগার এবং ধানপৎ সিং দুগার পঙ্ক মার্বেলের কাজ সমৃদ্ধ এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। আদিনাথ ,পরেশনাথ এবং মহাবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয় এই মন্দিরে। এছাড়া মার্বেল পাথরে খোদাই করা বুদ্ধগয়ার পরেশনাথ পাহাড়, পালকি, যানবাহনের মানচিত্রটি সত্যিই অসাধারণ।
কাঠগোলা বাগানের ভেতর মাটি থেকে একটু উঁচুতে একটি ডান্সিং ফ্লোর আর জলসাঘর আছে। শোনা  যায় এটি আগে বেলজিয়াম গাছ দিয়ে ঢেকে রাখা হতো ।এখানে নিয়মিত জলসা হত। জগৎ শেঠ এবং ইংরেজরা এখানে নিজেদের মনোরঞ্জনের জন্য আসতেন। পলাশী যুদ্ধে ঘটে যাওয়া নির্মম বিশ্বাসঘাতকতার অনেক কাহিনীর সাক্ষী এই জলসা ঘর।
বাগানের ভিতর আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সুরঙ্গ পথ আছে যেটি ভাগীরথী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ।শোনা যায় এই সুরঙ্গ পথে জগৎশেঠের বাড়ি পর্যন্ত যাওয়া যেত।



এই কাঠগোলা নামটি এসেছে কাঠগোলাপ নাম থেকে ।এই অঞ্চলে প্রচুর কাঠের ব্যবসা করা হতো এবং ছিল সুবৃহৎ একটি গোলাপের বাগান। সেই থেকে এই জায়গার নাম হয় কাঠগোলাপ ।তারপর ধীরে ধীরে নামটি পরিবর্তিত হয়ে কাঠগোলা হয়ে যায়।


No comments:

Post a Comment