Trending

Wednesday, 26 June 2019

কি রহস্য লুকিয়ে আছে গুহার মধ্যখানে





আমাদের ভারতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গেলে যেমন পাহাড়-জঙ্গল সমুদ্র ইত্যাদি জায়গার বর্ণনা করতে হয় ,তেমনি কিন্তু পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা অথবা প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট অসংখ্য গুহার কথা না বললেই নয়। এই গুহা গুলি থেকে আমরা যেরকম ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারি তেমনি এই গুহার গায়ের শিল্পকলা এবং ভাস্কর্য থেকে সেই সময়কার মানুষদের শৈল্পিক মন এবং রুচির পরিচয় পাওয়া যায়। সেইরকমই দুটি গুহার সন্ধানে আজ আমরা চলেছি উদয়গিরি এবং খণ্ডগিরিতে।



উদয়গিরি এবং খণ্ডগিরি গুহা গুলি কিছুটা প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট আবার কিছুটা কৃত্রিমভাবে অর্থাৎ মানুষের দ্বারা সৃষ্ট ।বলতে গেলে মানুষ এবং প্রকৃতি দুজনে যৌথ উদ্যোগে এগুলি কে তৈরি করেছে। ওড়িশা রাজ্যের ভুবনেশ্বর শহরের কাছাকাছি অবস্থিত এই গুহা গুলি প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় দিক থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।



এই গুহাগুলি পাশাপাশি অবস্থিত উদয়গিরি এবং খণ্ডগিরি পাহাড়। যাদেরকে হাতি গুম্ফা শিলালিপিতে কুমারী পর্বত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। অত্যন্ত চমৎকারভাবে নির্মিত এই গুহা গুলি কলিঙ্গরাজ খারবেল এর রাজত্ব কালীন সময়ে জৈন ধর্মাবলম্বী সাধকের আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতে হতো বলেই ধারণা করা হয়। উদয়গিরি তে 18 টি এবং খণ্ডগিরি তে 15 টি গুহা আছে।



উদয়গিরি গুহা গুলি হল-রানী গুম্ফা, ছোট হাতি গুম্ফা, জয় বিজয় গুম্ফা, অলকাপুরী গুম্ফা, বা যাহারা গুম্ফা, পানাশ গুম্ফা, ঠাকুরানী গুম্ফা, পাতালপুরী গুম্ফা, মঞ্চ পুরী গুম্ফা, গনেশ গুম্ফা, জামবেশ ভরা গুম্ফা, ব্যাঘ্র গুম্ফা, হাতি গুম্ফা, সর্প গুম্ফা, রোশাই গুম্ফা, হরিদাস গুম্ফা, ধ্যান হারা গুম্ফা।খণ্ডগিরি গুহা সমূহ হলো-তাতোয়া গুম্ফা১, তাতোয়া গুম্ফা ২, তেনতুলি গুম্ফা, খণ্ডগিরি গুম্ফা, অনন্ত গুম্ফা, ত্রিশূল গুম্ফা, নব মুনি গুম্ফা, ধ্যান গুম্ফা, ররভোঝি গুম্ফা, আম্বিকা গুম্ফা, খেসারি গুম্ফা, একাদশী গুম্ফা। এ ছাড়া বাদবাকি গুহা গুলির নাম পাওয়া যায়নি।



উদয়গিরি খণ্ডগিরি নাম রাখার পিছনে কি কারণ সেটা জানা যায় না ,তবে উদয়গিরি কথার অর্থ হল উদীয়মান সূর্য। এবং খণ্ডগিরি কথার অর্থ ভেঙে পড়া পর্বত। এই গুহা গুলি কমপক্ষে 2200 বছরের পুরনো। উদয়গিরি খণ্ডগিরি উচ্চতা যথাক্রমে 34 মিটার ও 38মিটার। মৌর্য সম্রাট অশোক এর সাথে ভারতের প্রায় সমস্ত রাজ্যের নাম জড়িয়ে আছে এবং গোটা ভারতে ওনার নাম এর মুদ্রা প্রচলিত ছিল। কারণ সত্যপুত্র, কেন্দ্রপুত্র ,পান্ডু রাজ্য এবং চোল রাজ্য বাদে সুদূর আফগানিস্তান থেকে গোটা ভারতে তার শাসনের আওতায় ছিল। মহামতি অশোক একটি যুদ্ধ করেছিলেন। সেটি কলিঙ্গ যুদ্ধ। এই যুদ্ধে তিনি এক লক্ষ সেনাকে হারিয়েছিলেন এবং দেড় লক্ষ কলিঙ্গ বাস বন্দি হয়েছিল। দয়া নদী রক্তের নদীতে পরিণত হয়েছিল। গোটা কলিঙ্গ শ্মশানে পরিণত হয় এবং কলিঙ্গ বাসি তাদের সমস্ত কিছু হারিয়ে ফেলেন। যুদ্ধের বিভৎসতা দেখে অশোক রাজনীতি পরিত্যাগ করে ধর্ম বিজয় নীতি গ্রহণ করেন এবং বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন এদিকে শ্মশানে পরিণত হওয়া কলিঙ্গ কে পুনরায় সংগঠিত করেন চেদি বংশের তৃতীয় রাজা খারবেল। তিনি জৈন ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। গোটা বছরই জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের সাধু-সন্তরা সারা বিশ্বের ভ্রমণ করে বেড়াতেন। বর্ষাকালে তাদের থাকার খুবই অসুবিধা হতো সেই কারণে যাতে সন্ন্যাসীরা নিভৃতে তাদের ধর্ম তত্ত্ব আলোচনা করতে পারেন তাই তিনি এই গুহা গুলি নির্মাণ করেন। এই গুহা গুলি সন্ন্যাসীদের বিশ্রামের জন্য এবং ধর্মতত্ত্ব আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এক একটি গুহায় দুজন করে সন্ন্যাসী থাকতেন।



খণ্ডগিরি শিখরে একটি প্রাচীন মন্দির আছে সেখানে আজও নিত্য পূজা হয়। উদয়গিরির হাতি গুম্ফা উৎকীর্ণ করা আছে খারবেল এর বিজয় যাত্রা এবং জৈন ধর্ম পালনের বিবরণ। লিপি টি প্রাকৃত ভাষায় লেখা ।এতে খারবেল এর রাজত্বকালের 13 বছরের বিবরণ বর্ণিত আছে।খারবেল এরপর উদয়গিরি খণ্ডগিরি ইতিহাস সম্পর্কে আর বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে এই গুহা গুলি সন্ন্যাসীদের আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার হত। এরপর পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে খণ্ডগিরি ত্রিশূল গুম্ফায় তীর্থঙ্করদের উৎকীর্ণ দিগম্বর মূর্তি সংযোজন করা হয়। আনুমানিক অষ্টাদশ শতকে ঋষভদেবের মন্দির নির্মাণ করা হয়।





















উদয়গিরি তে অবস্থিত রানী গুম্ফা টি সবথেকে সুন্দর এবং বড়। একটি সবচেয়ে নবীনতম গুহা। এটিকে রানীর মহল বলা হয় ।এর নিচে সাতটি কক্ষএবং উপরে নয়টি কক্ষ। এর দেওয়ালের সাধারন মানুষের জীবন যাত্রার ছবি খোদাই করা আছে। গবেষণায় জানা গেছে এর উপরের কক্ষ গুলিতে শব্দ বিজ্ঞানের প্রয়োগ লুকিয়ে আছে। এছাড়াও এর জল নিকাশি ব্যবস্থা চোখে পড়ার মতো।এক কথায় উদয়গিরি এবং খণ্ডগিরি গুহা গুলি ইতিহাস ও ধর্মের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।





No comments:

Post a comment