Trending

Wednesday, 10 July 2019

আদিম মানুষের দেশে



ইন্টারনেট, কৃত্রিম উপগ্রহ, রোবট সমৃদ্ধ বিজ্ঞানের যুগে এখনো কিছু কিছু স্থানে এমন কিছু মানুষ আছে যারা সৃষ্টির প্রথম প্রভাতের মতোই আজও স্বাধীনভাবে প্রকৃতির সন্তান হিসেবে বিচরণ করছেন। এদের কারোর গায়ে যান্ত্রিক সভ্যতার ছোয়া লাগেনি এবং যান্ত্রিক সভ্যতার সভ্য  মানুষগুলিকে নিজেদের থেকে দূরে রাখতে তারা পছন্দ করে। নিজেদের মতন করে নিজেদের জগৎটাকে সাজিয়ে তথাকথিত সভ্য সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এ মানুষগুলি নিজস্ব একটা জগত তৈরি করেছে। আজ আমরা এ রকমই একটি জনগোষ্ঠী সম্পর্কে আলোচনা করব।



আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় হল সেন্টিনেলী জনগোষ্ঠী। বঙ্গোপসাগরের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠী আন্দামানী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠী গুলির মধ্যে এটি হলো একটি। গ্রেট আন্দামান উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপ পুঞ্জে এই জনগোষ্ঠী বসবাস করে।



এই জনগোষ্ঠীর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এরা বহিরাগত দের উপর অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। এই জাতিটি মূলত একটি শিকারি জাতি। এরা বেঁচে থাকার জন্য বন্য জীবজন্তু, মাছ ইত্যাদি শিকার করে এবং ফলমূল খেয়ে জীবন যাপন করে। তাদের সম্পর্কে যতটুকু খবর পাওয়া গেছে তাতে জানা গেছে যে তারা এখনো অব্দি কৃষি কাজ তো দূর আগুনের ব্যবহার পর্যন্ত করে না।



সেন্টিনেলী দ্বীপ ভারতের কেন্দ্রীয় শাসন এর আওতাধীন ।এটি আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের একটি অংশ। তবে বাস্তবে এরা সম্পূর্নভাবে নিজেদের মতন বসবাস করে। ভারতের কোন শাসন বা নিয়ম কানুন এখানে খাটে না। ভারত সরকার শুধুমাত্র বিশেষ কাজে এই দ্বীপের পর্যবেক্ষণ চালানো , পর্যটকদের এই দ্বীপে যেতে উৎসাহ না দেওয়া, আর বিশেষ কিছু অনিয়মিত পর্যবেক্ষণ এখানে চালান ‌। এটি কেবলমাত্র খাতায়-কলমে ভারত সরকারের অধীন কিন্তু বাস্তবে তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন।





1967 সাল থেকে ভারতীয় সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সেন্টিনেলি দের  সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য। নৃতাত্ত্বিক ও ভারতের ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার ম্যানেজমেন্টের মহানায়ক টি এন পণ্ডিত এর নেতৃত্বে সেন্টিনেলী দের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা হয় বেশ কয়েকবার। যেমন সমুদ্র সৈকতে খাবার এবং নারকেল ছড়িয়ে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করার প্রয়াস চালানো হয়েছিল। প্রথমে মনে হচ্ছিল এই অভিযানগুলো ফলদায়ী কিন্তু 1 990 সালে জারোয়াদের সঙ্গে ঘটা কিছু ঘটনায় পর পর কয়েক জন মানুষ প্রাণ হারায়। এছাড়া এই অভিযান এর পরে একটি বিষাক্ত রোগ ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। তাই অভিযান বন্ধ করে দেওয়া হয়। 



2006 সালে সেন্টিনেলী রা তাদের দ্বীপে ভুল করে প্রবেশ করা দুজন জেলেকে তীর দিয়ে হত্যা করে। ভারতীয় উদ্ধারকারী দল হেলিকপ্টারে করে তাদের উদ্ধার করতে গেলে সেন্টিনেলী রা তীর নিয়ে হেলিকপ্টারটিকে তাড়া করে। হেলিকপ্টারের পাখার তীব্র হাওয়ায় বালি চাপা দেওয়া সেই জেলেদের মৃতদেহ দেখা গেলেও তাদেরকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
দক্ষিণ আন্দামান দ্বীপের বন্দর শহর থেকে 36 কিলোমিটার দূরে রয়েছে এই সেন্টিনেলী দ্বীপ। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে এর দূরত্ব 50 কিলোমিটার। এই দ্বীপে জনসংখ্যা সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে আন্দাজ করা হয় এখানকার জনসংখ্যা প্রায় আড়াইশো জন।



1980 সালের ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদ এম ভি পোর্টম্যান তার দল নিয়ে সেন্টিনেল দ্বীপে প্রথম গিয়েছিলেন সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য। তিনি একটি পৌঢ় দম্পতি এবং তাদের দুটি শিশু সন্তানকে নৌকায় তুলে নিয়ে আসেন। তাদেরকে পোশাক-আশাক দেওয়া হয় এবং সভ্য সমাজের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করা হয় ।কিন্তু সভ্য সমাজে আসার পরে তারা রোগে পড়েন এবং প্রৌঢ় দম্পতি মারা যান। এরপর ওই শিশু দুটিকে প্রচুর খাবার এবং খেলনাসহ ওই দ্বীপে ফিরিয়ে দিয়ে আসা হয়। এই ঘটনার পর থেকেই মূলত সেন্টিনেলী দের আক্রোশ আরো বেড়ে যায় সভ্য মানুষের প্রতি। তারা যেমন নিজেদের জগতের বাইরে কারো কোন ব্যাপারে নাক গলায় না। তেমনি তাদের ব্যাপারে কেউ নাক গলাক এটা তারা একদমই পছন্দ করে না। সম্প্রতি মার্কিন পর্যটক এলেন চাও নর্থ সেন্টিনেলী দ্বীপ গিয়েছিলেন। তাকেও বী তীরের আঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করে সেন্টিনেলী রা। তাই ভারত সরকার সম্পূর্ণভাবে ওই দ্বীপে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে এবং ওই দ্বীপের চারপাশ বরাবর একটি সীমারেখা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে।



 সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো 2004 এর সুনামিতে এই উপজাতি কোন ক্ষতি সেরকম ভাবে হয়নি। হয়তো প্রকৃতির সন্তান বলে প্রকৃতি তাদের রক্ষা করেছে। আদৌ কোনদিনও সভ্য সমাজের মানুষের সঙ্গে তারা সম্পর্ক স্থাপন করবে কিনা সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই।

No comments:

Post a comment