Trending

Monday, 1 July 2019

প্রণাম জানাই সেই বীর সৈনিক কে যে মৃত্যুর পরেও প্রহরারত



আমাদের ভারতীয় সেনা জওয়ানদের বীরত্বের কাহিনী গোটা পৃথিবীর লোকের কাছে পরিচিত। দেশের জন্য উৎসর্গীকৃত প্রাণ এই বীর জওয়ানরা করতে পারেনা এমন কোন কাজ পৃথিবীতে নেই। তবে তার মধ্যেও এমন কিছু জওয়ান আছেন যারা এমন কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন যা সত্যিই অদ্ভুত এবং অতুলনীয়। আজ আমরা আলোচনা করব সেই বীর সৈনিক এর সম্পর্কে। যিনি মৃত্যুর এত বছর পরেও নিজের কর্তব্যে অটল।



আজ আমরা আলোচনা করতে চলেছি বাবা হরভজন সিং এর বীর গাঁথা এবং অলৌকিক কাহিনী। মৃত্যুর এত বছর পরেও তিনি আজ ও সেনাবাহিনীতে কর্মরত। এবং সমস্ত নিয়ম মেনে তার পদোন্নতি ও হয়। ভারতীয় এবং চীন সেনারা সকলেই তার অস্তিত্বকে স্বীকার করে।



1946 সালের 30 শে আগস্ট বাবা হারভজন সিং বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। স্কুল জীবন শেষ করার পরে তিনি 1964 সালে ভারতীয় সেনার পাঞ্জাব রেজিমেন্টে যোগদান।1966 সালে তিনি সিকিম রেজিমেন্টে বাঙ্কার ইন চার্জ হিসেবে নিযুক্ত হন। তার পরের বছর অর্থাৎ 1967 সালে তার পোস্টিং হয় পূর্ব সিকিমের নাথুলা পাশে। তার পরের বছর 1968 সালের চৌঠা অক্টোবর কর্তব্য পরায়ন এই বীর সৈনিক নিজের সেনাদের জন্য মালপত্র আনছিলেন খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে। প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ে তিনি পা পিছলে প্রবল হিমবাহের মধ্যে পড়ে যান। হিমবাহের প্রবল স্রোত তার দেহ দু'কিলোমিটার ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এই ঘটনা তখন অজানা ছিল ভারতীয় সেনার কাছে ।তাই কিছুদিন অতিবাহিত হবার পরেও যখন বাবা হরভজন সিং তার ক্যাম্পে ফিরে আসেননি।  তখন সেনা নিয়মানুযায়ী তাকে নিখোঁজ বলে ঘোষণা করা হয়। সেদিন রাতেই তিনি তার এক সহকর্মী কে স্বপ্নে দেখা দেন এবং তার সঙ্গে ঠিক কী হয়েছিল সেটি জানান। এমনকি কোথায় গেলে তার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যাবে সেই ইঙ্গিত  তিনি দেন। কিন্তু সেই সেনার স্বপ্নের কথা বাকি সৈন্যরা বিশ্বাস করতে চায়নি। তবে যারা বিশ্বাস করেছিল তাদের সঙ্গী করে শুরু হয় বাবা হরভজন সিং এর মৃতদেহ খোঁজার কাজ। সত্যি সত্যি সেই স্থানেই বাবার মৃতদেহ খুজে পাওয়া যায় যেখানে তিনি তার মৃতদেহ খুজে পাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এমনকি স্বপ্নে তিনি জানিয়েছিলেন তার ডান পায়ে চোট আছে। পোস্টমর্টেমের পর দেখা যায় একথা সত্যি।



স্বপ্নে দেখা সেই সমস্ত কথা বাস্তবে সত্যি প্রমানিত হওয়ার পর এবার আস্তে আস্তে অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেন বাবা হারভজন সিং এর আত্মার অস্তিত্বের কথা
 এর কিছুদিন পর তিনি আবার স্বপ্নে আসেন এবং তার একটি সমাধি তৈরি আর্জি জানান এবং তিনি এও বলেন এখনো তিনি নাথুলা পাস এ দেশের জন্য কর্তব্যরত।
তারপর সিকিম নাথুলা পাস এ তৈরি হয় বাবা হারভজন সিং এর মন্দির ।এই মন্দিরের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয়টি হলো এখানে  জল রেখে গেলে সেই জল 21 দিন পর এমন চমৎকার এ পরিণত হয় যে কোনো ব্যথা বা আঘাত নিরাময়ে সক্ষম।



মৃত্যুর পরেও বাবা হারভজন সিং চিনা সৈনিকদের গতিবিধির ওপর নজর রাখেন, এবং তা ভারতীয় সৈনিকদের স্বপ্নে জানিয়ে দেন। এমন  কি কিছু সৈনিক স্বীকার করেছেন যে তারা অন্ধকার রাতে ঘোড়ার উপরে প্রহরারত এক সৈনিককে দেখেছেন অথচ সেই সময় সেখানে কোনো সৈনিকের থাকার কথাই ছিল না। আর সেটা যে বাবা হরভজন সিং নিজেই সে কথা তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে সৈনিকদের জানান। এছাড়াও বাবা যে রাত্রে কর্তব্যরত ছিলেন তার প্রমান পাওয়া যায় তার জুতো থেকে। এখানে বলে রাখা দরকার এখনো পর্যন্ত বাবা হরভজন সিং এর সমস্ত পোশাক, অস্ত্র , জুতো সমস্ত কিছুই সাজানো থাকে তার শয়ন কক্ষে।  এবং এখানে প্রহরারত সৈনিকদের দাবি প্রত্যেকদিন সকালে পরিষ্কার জুতো রাখা থাকে। পরের দিন সকালে এসে দেখা যায় সে জুতোয় কাদা মাটি লেগে রয়েছে। সে কাদামাটি কিন্তু নাথুলা পাস সংক্রান্ত এলাকার নয় চিনা বর্ডার এর পার্শ্ববর্তী এলাকার কাদামাটি। এছাড়াও বাবার বিশ্রাম কক্ষে বিছানার চাদরটি প্রত্যেক রাতে পরিপাটি করে বিছিয়ে দেওয়া হয়। অথচ সকালে উঠে দেখে মনে হয় সেখানে কেউ বিশ্রাম করেছেন। এই ঘটনার কথা স্থানীয় মানুষজন এবং কর্তব্যরত সৈনিক রা স্বীকার করেছেন।



1969 সালে ভারত সরকার তাকে মরণোত্তর মহাবীর পরম চক্রদ্বারা সম্মানিত করেন। তিনি যেমন ভারতীয় সৈনিকদের চীনা সৈনিকদের গতিবিধি সম্পর্কে জানান দেন তেমনি চীনা সৈনিকদের গতি বিধি বা তাদের পদক্ষেপ তার পছন্দ না হলে সেটা তিনি চিনা সৈনিকদের ও স্বপ্নের মাধ্যমে জানিয়ে দেন। যাতে দুই দেশের মধ্যে কোন তিক্ততার সম্পর্ক তৈরী না হয়। আজ ভারত এবং চীনে  ঘটনা বিশ্বাস করে। সে কারণে প্রতি মাসে  ভারত ও চীনের ফ্ল্যাগ মিটিং এর সময় একটি অতিরিক্ত চেয়ার ফাঁকা অবস্থায় রাখা হয় ।দু'দেশের সেনা কর্তারা  বিশ্বাস করেন সেখানে বাবা হারভজন সিং অধিষ্ঠান করেছেন। বাবা হরভজন সিং এর এই সমস্ত অলৌকিক কার্যকলাপের জন্য এখনও তিনি ভারতীয় সৈনিক এর পেরোলে আছেন। অন্যান্য সৈনিকদের মতনই প্রতি মাসে তার বেতন হয়। এবং বছরে তিনি দুমাসের ছুটি পান। তার পদোন্নতি ও হয় অন্যান্য সৈনিকদের মত।এখন তিনি ক্যাপ্টেন পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।



নাথুলা পাস এর এই মন্দিরে কনকনে ঠান্ডায়, প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও প্রতিবছর অসংখ্য ভক্ত আসেন বাবার মন্দির দর্শনে। 14 হাজার ফুট অতিক্রম করে ভক্তগণ বাবার পবিত্র থানে একবার মাথা ঠেকিয়ে যান। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রত্যেক ভক্তের জন্য খাওয়া এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়। বাবা হরভজন সিংহ এক লড়াকু মানুষের প্রতীক, যিনি মৃত্যুর পরেও তাঁর কর্তব্যে অটল। এ মানুষটি এখনো যেমন ভারতীয় সেনাদের লড়াই করার শক্তি যোগান, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকা এবং টিকিয়ে রাখার সাহস যোগান তেমনি এই পৃথিবীর প্রত্যেকটি লড়াকু মানুষকে হার না মানার মন্ত্র দেন।

No comments:

Post a comment