Trending

Thursday, 4 July 2019

অতীত নিদর্শনের সন্ধানে বড়শুল জমিদার বাড়ি



আমরা বর্তমানের যান্ত্রিকতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি ঠিকই, তবে অতীতের প্রতি কৌতূহল কিন্তু সব সময় থেকে যায়। কেমন ছিল অতীতকালে আমাদের জীবন যাপন পদ্ধতি, কেমন ছিল সেই সময়কার বইপত্র, এ সমস্ত নানা প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকে আমাদের মনের মধ্যে। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে সবসময়ের অতীতের নিদর্শনগুলি কে হাতের কাছে পাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। কারণ বিভিন্ন সরকারি নিয়মাবলির ফাঁদে পড়ে সেগুলো আমাদের কাছে অধরাই থেকে যায়। বড়জোর মিউজিয়ামে আমরা দূর থেকে তাদের দেখতে পাই, কিন্তু ছুতে পারি না।তবে আজ আমরা এমন একটি জায়গায় চলেছি যেখানে অতীত নিদর্শনগুলোকে আমরা হাত দিয়ে ছুতে পারব, খুব কাছ থেকে তাদের দেখতে পাবো। স্থানটি হল বড়শুল জমিদার বাড়ি।

বড়শুল জমিদার বাড়ি যেতে হলে আপনাকে হাওড়া বর্ধমান লোকাল ধরে চলে আসতে হবে শক্তিগড়ে। হ্যাঁ সেই শক্তিগড় যেটি ল্যাংচার জন্য বিখ্যাত। শক্তিগড়ে নেমে ল্যাংচা পরখ আপনি করে নিতেই পারেন। তার পাশেই দেখবেন একটি মন্দির রয়েছে ঝিলের গায়ে। মন্দির অপূর্ব মাহাত্ম্য মনের মধ্যে এক আধ্যাত্মিকতার পরশ দিয়ে যায়। মন্দির দর্শনের পর গুটি গুটি পায়ে চলে আসুন আমাদের আজকের গন্তব্য বড়শুল জমিদার বাড়িতে।



বড়শুল এর এই জমিদার বাড়ি অনেক বছরের পুরনো। যখন বর্ধমানের রাজার রাজত্ব ছিল ।রাজা বিজয় দেব এর সময় তৈরি হয় এই বড়শুল জমিদার বাড়ি। জমিদার বাড়ির অবস্থা এখন আর আগের মতো নেই ।তবে প্রাচীন ঐতিহ্য তো রয়েই গেছে।



এই জমিদার বাড়িটির দোতালায় সম্পূর্ণ নিজ প্রচেষ্টায় একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা নির্মাণ করেছেন হিমাদ্রি শংকর দে। অতিথিদের জন্য এই সংগ্রহশালা সব সময় খোলা থাকে। বড়শুল জমিদার বাড়ি দর্শনে গেলে আপনাকে অবশ্যই আসতে হবে এই সংগ্রহশালায়। হিমাদ্রি বাবুর কথায় অতীতকে সংরক্ষণ না করলে সে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে। আর আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর হদিশ পাবে না। তাই এখনো যে সমস্ত মানুষেরা অতীতকে জানতে চান, অতীতের প্রতি যাদের কৌতুহল আছে তাদের কৌতুহল নিবারনের জন্য এবং অবশ্যই কালের প্রবাহ থেকে বস্তুগুলি কে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তিনি নিজ প্রচেষ্টায় নির্মাণ করেছেন এই সংগ্রহশালা। তাহলে জেনে নিই সংগ্রহশালায় কি কি আছে।



প্রথমে আমরা দেখব তার সংগ্রহে রয়েছে বেশকিছু তালপাতার পুঁথি। যে তাল পাতা পুঁথির কথা আমরা ইতিহাসে পড়েছি। সেই তালপাতার পুঁথি কে ইচ্ছে হলে আপনি একবার ছুঁয়ে দেখতে পারেন। আর তালপাতার পুঁথি উপর লেখা গুলি কি কালি দিয়ে লেখা হতো জানেন? আমলকি পুড়িয়ে যে ছাই তৈরি হয় সেই ছাইকে ছাগলের দুধ দিয়ে বেটে এ কালি তৈরি করা হতো। সে কালি দিয়ে লেখা হতো অতীতের সমস্ত পুথি। সেই কালি গুলির স্থায়িত্ব এতটাই যে আজ প্রায় দুশো তিনশো বছর পরেও কোথাও এতটুকু অস্পষ্ট হয়নি। তাল পাতা পুঁথির মোহ কাটলে এবার চোখ ফেরানো অন্যদিকে। দেখবেন অতীতের পারফিউম ব্যবহারের বিচিত্র পদ্ধতি। আর সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় তো এটা যে, কত বছর পুরনো পারফিউমে র  শিশিতে এখনো সুগন্ধ লেগে আছে। এছাড়া রয়েছে টরেটক্কা মেশিন, টেলিফোনের যন্ত্র, আগেকার টেলিগ্রাফ মেশিন, বিভিন্ন ধরনের দোয়াত দানি, বিভিন্ন ধরনের কলম। কলমের শৌখিনতাও দেখার মত ।জোরির কলম, মোষের শিং এর কলম ,ব্রিটিশ আমলের কলম ,বিভিন্ন ধরনের কলম আপনি এখানে দেখতে পাবেন। বহু প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য বই ,ম্যাগাজিন, কোম্পানির চিঠি ,স্ট্যাম্প পেপার সমস্ত কিছুই আছে এই ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায়। আরেকটি মজাদার জিনিস আছে, সেটি হলো কাশ্মীরি কাঠের একটি গয়নার বাক্স।যেটিকে শত চেষ্টা করলেও আপনি খুলতে পারবেন না যদি এটি খোলার সঠিক পদ্ধতি আপনার না জানা  থাকে। এমনই আরো অনেক বিচিত্র জিনিসপত্রে সাজানো রয়েছে এ ব্যক্তিগত সংগ্রহ শালা, যা দেখলে আশ্চর্য হতেই হয়।জমিদার বাড়ির পাশেই রয়েছে দোল মন্দির ।সেখানে এখনো মহা ধুমধাম করে দোল উৎসব পালিত হয়।



বড়শুল জমিদার বাড়ি পরিভ্রমণ শেষ করে এবার চলে আসুন ডঃ বিধান চন্দ্র রায় স্থাপিত উন্নয়নী তে। ডঃ বিধান চন্দ্র রায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তৈরি করেছিলেন এই সুন্দর বাগান। আম গাছে ঘেরা এ বাগানটিতে রয়েছে বাংলার সংস্কৃতির ছোঁয়া।আরেকটু এগিয়ে গেলে গ্রামীণ হাট আপনাকে স্বাগত জানাবে।আমাদের শহরের শপিং মল এবং সুপার মার্কেট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এই হাট ব্যবস্থা। নির্দিষ্ট একটি দিনে বহু দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসে কেনা বেচা করার জন্য। একটি দিনের জন্যই এখানে যেন মেলা বসে যায়। সবজি, মাছ থেকে শুরু করে রেডিমেড পোশাক এবং বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সামগ্রী নিয়ে ব্যবসায়ীরা এখানে পসরা সাজিয়ে বসেন প্রতি রবি এবং বুধবার। হাটের ঠিক পাশেই আছে পীর বাবার স্থান ।এখানে ছিলেন বড় রসুল। তার নাম অনুযায়ী এই জায়গাটির নাম হয়েছে বড় শুল। এবার আপনি চলে আসতে পারেন দামোদরের ডিভিসি ক্যানেলে। মূলত সেচ ব্যবস্থার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে এই ক‍্যানেলকে।



সারাদিন এত ঘোরাঘুরি করার পর ক্লান্ত দেহ মন কে শান্ত করতে চলে আসুন দামোদর নদীর পারে। নদীর শান্ত বাতাস নির্মল প্রকৃতি আপনাকে স্বাগত জানাবে। ইচ্ছে হলে আশেপাশের সবজি ক্ষেতগুলো ঘুরে দেখতে পারেন। এক কথায় বলা যেতে পারে নির্ভেজাল গ্রাম্য প্রকৃতির মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করার সুযোগ রয়েছে এখানে। ফ্লাট বন্দি জীবনের সীমাবদ্ধতার বাইরে উদার উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝখানে সহজ-সরল গ্রাম্য জীবন যাপন খুব একটা খারাপ লাগবে না। কলকাতা থেকে শক্তিগড়ের দূরত্ব বেশি নয় ।তাই ভোর ভোর বেরিয়ে পড়লে সারাদিন ঘুরে ফিরে সন্ধের মধ্যে বাড়ি পৌঁছে যেতে পারবেন। না হবে কাজের ক্ষতি, না হবে সময়ের অপব্যয়। শুধু সঞ্চয় হবে অতীত থেকে পুরনো কিছু অমলিন স্মৃতি আর বুক ভরা টাটকা বাতাস।



বাসে অথবা ট্রেনে করে শক্তিগড় পৌঁছে সারাদিনের জন্য একটি টোটো ভাড়া করে গোটা বর্ষ এবং দামোদর নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন খুব সহজেই ঠিক করে ফেলুন কবে আসবেন।



No comments:

Post a comment