Trending

Wednesday, 3 July 2019

পবিত্র ভূমি কামারপুকুর


ঘুরতে বেড়াতে আমরা সকলেই ভালোবাসি। তাই সময় সুযোগ পেলেই টুক করে বেরিয়ে পড়ি নতুন নতুন জায়গায়। নতুন জায়গা ,নতুন মানুষ জন, নতুন প্রকৃতি সবকিছু আমাদের মনে কৌতূহলের যেমন অবসান ঘটায় ,তেমনি আমাদের ক্লান্তি হতাশা কে দূর করে আমাদের আরো বেশি প্রাণবন্ত করে তোলে। আর সেই প্রাণ আরো অনেক বেশি সতেজ সজীব হয়ে ওঠে যদি ভ্রমণ স্থানের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতা মিশে যায়। কোন এক ঐশ্বরিক শক্তি যেন চুম্বকের মত আকর্ষণ করে নেয় আমাদের দেহ ও মনের সমস্ত জড়তা, সমস্ত কালিমাকে। এক অনিন্দ্যসুন্দর প্রশান্তি আর শক্তি যোগান দেয় আমাদের শরীরে ও মনে। তাই আজ আমরা চলেছি এমনই এক পবিত্র ভূমিতে ,যেখানে গেলে মন প্রশান্ত হবেই ,তার সঙ্গে সঙ্গে ভ্রমণের কৌতুহলও নিরসন হবে।



আমাকে আজকের গন্তব্য কামারপুকুর। আমরা সকলেই জানি কামারপুকুর হলো শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের পবিত্র জন্মভূমি। এর সঙ্গে আমরা ভ্রমণ করে নেব জয়রামবাটি। শ্রী শ্রী মা সারদার জন্মভূমি ।কথিত আছে একবার শ্রী রামকৃষ্ণ দেব সারদা দেবী কে বলেছিলেন তার মৃত্যুর পর যেন সারদা দেবী কামারপুকুরে অধিষ্ঠান করেন। এবং অত্যন্ত সহজ-সরল ভাবে জীবন যাপন করে ঈশ্বরের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। সেই পবিত্র জন্মভূমির দর্শনে কার না মন চায় ‌ ?যে স্থানে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের জন্ম হয়েছিল আজ সেখানেই তৈরি হয়েছে রামকৃষ্ণ মঠ এবং মন্দির।




ঠাকুর এর সেই বাড়ি, তার বৈঠকখানা ,বাড়ির উঠোনে রাখা সেই আমগাছ সমস্ত কিছু আগের মত আছে। বাড়ির পিছনে ই আছে সেই শিব মন্দির ,যেখানে ঠাকুরের মা চন্দ্রাদেবীর  গর্ভে হঠাৎ করে দিব্য জ্যোতি প্রবেশ করেছিল ।সত্যি কি আশ্চর্যের বিষয় তাই না? কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্যি ,বাস্তব।




ঠাকুরের বাড়ির কাছেই আছে হালদার পুকুর। যে পুকুরে রামকৃষ্ণদেব স্নান করতেন। এ পুকুরটি বর্তমানে মঠ কর্তৃপক্ষের অধীনে। পুকুরের জলে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে অসংখ্য মাছ। মঠের লাগোয়া বিপণন কেন্দ্রে বিক্রি হচ্ছে অসংখ্য ধর্মীয় পুস্তক, বিভিন্ন রকম হাতের কাজের সামগ্রী, এবং আরো নানা জিনিস। ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে গেলে চলে যান চন্দ্রমণি দেবীর নামাঙ্কিত প্রসাদ কক্ষে। এখানকার প্রসাদ পক্ষ টি বিশাল। একসঙ্গে প্রায় 500 জন ভক্ত কে বসিয়ে খাওয়ানোর বন্দোবস্ত আছে এখানে। গরম কালে ভক্তদের সংখ্যা কিছুটা কম হলেও শীতকালে এত বেশি ভিড় হয় ভক্তদের যে তিনটি ভাগে ভাগ করে প্রসাদ বিতরণ করতে হয়।থাকার জন্য রামকৃষ্ণ মঠের নিজস্ব যাত্রীনিবাস আছে। সেখানে আপনি অতি সুলভে থাকতে পারেন। থাকার ব্যবস্থাটা পাকা করে বেরিয়ে পরুন লাহাদের বিষ্ণুমন্দির এবং পাঠশালা দর্শনে। সামনে চণ্ডীমণ্ডপ এর কাছে রয়েছে পাঠশালা ।এই পাঠশালাতে বিদ্যাভ্যাস শুরু হয়েছিল শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ।আর এর পিছনেই রয়েছে বিষ্ণুমন্দির ।এ বিষ্ণুমন্দির এর  একটি বৈশিষ্ট্য আছে। এই মন্দিরটি মাটির নিচে একতলা বিশিষ্ট। শোনা যায় এটি নির্মিত হয়েছিল বর্গী আমলে ।তাই যখন তখন লুটপাটের ভয় লেগেই থাকত। আর সে কারণেই জমিদারেরা মন্দির টিকে এমন ভাবে নির্মাণ করেছিলেন যাতে লুটপাটের সময় সহজেই মাটির নিচে ধনরত্ন নিয়ে লুকিয়ে রাখা যায়। যখন শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পড়াশোনায় মন বসত না তখন তিনি এই মন্দিরের সামনে এসে ছবি আঁকতেন। মন্দির দেখে সীতানাথ পাইনের বাড়ি দেখার পর চলে আসুন ধনী‌ কামারনীর মন্দিরে। এই ধনী কামারনী ছিলেন ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের ভিক্ষা মা এবং ধাত্রী মা। রামকৃষ্ণ মঠ এবং তার আশেপাশে জিনিস দেখা হয়ে গেলে কামারপুকুর এর পাশে একটু জিরিয়ে নিতে পারেন। 




কামারপুকুর দেখার পর জয়রামবাটি তো অবশ্যই দেখবেন। তবে তার আগে আরও একটি বিশেষ স্থানের কথা আমরা বলব যে স্থানটি কামারপুকুর এলে একবার অন্তত আপনার ঘুরে আসা উচিত। সেটি হল গড় মান্দারণ। কামারপুকুর থেকে মাত্র 4 কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গড় মান্দারণ। মূলত একটি ঐতিহাসিক স্থান। জানা যায় কামারপুকুরের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত মান্দারণ একটি ছোট গ্রাম ছিল। সেই গ্রামের অধিবাসীদের বাইরের শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মুঘল আমলে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ তৈরি করা হয় ।এর পাশ দিয়ে শুরু হয়ে বয়ে চলেছে আমোদর নদী। এই নদী কে সুকৌশলে কেটে তৈরি করা হয় পরীখা।



মূল ফটক থেকে বেশ কিছুটা পথ আসতে আসতে আপনি দেখতে পাবেন সুন্দর বাগান এবং বড় বড় গাছে ঘেরা এক মনোরম প্রাকৃতিক উদ্যান। উদ্যান দিয়ে হাটতে হাটতে দু কিলোমিটার পথ পার হতে না হতেই আপনি দেখতে পাবেন গৌরের  নবাব হুসেন শাহের সেনাপতি ইসমাইল গাজীর সমাধি। মুঘল আমলে নির্মিত গড় মান্দারণ এর দুর্গটির আর বিশেষ কিছুই অবশিষ্ট নেই। তবে দুর্গে প্রবেশের সিঁড়ি এবং কিছু ভাঙ্গা দেওয়াল দেখা যায় ।অবশ্য ইসমাইল গাজীর সমাধি টা আপনি এখনো দেখতে পারবেন ।আর পাবেন পাশ দিয়ে বয়ে চলা সেই আমদর নদীকে। যে নদী একসময় দুর্গ কে রক্ষা করত বাইরের শত্রুর হাত থেকে।





গড় মান্দারণ  এর ইতিহাসের সঙ্গে সময় কাটানোর পর চলে আসুন জয়রামবাটি। এখানে আছে মাতৃমন্দির। মা সারদা দেবীর কক্ষ এবং তার ব্যবহৃত নানা জিনিসপত্র সমস্ত কিছু অতি সুন্দর ভাবে সাজানো রয়েছে। জয়রামবাটিতে এই গোটা মন্দির চত্বরে যেন এক অদ্ভূত কোমল স্পর্শ মাখানো। যে স্পর্শ আপনি নিজেও অনুভব করবেন ।এটি কতটা ঐশ্বরিক কতটা বাস্তব তা নিয়ে তর্কে না যাওয়াই ভালো। শুধুমাত্র মনকে শান্ত করা এ পরিবেশ বহুদিন মনের মনিকোঠায় সজীব হয়ে রইবে তাই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে একবার অন্তত ঘুরে যেতে পারেন কামারপুকুর জয়রামবাটি এবং অবশ্যই গড় মান্দারণ।



No comments:

Post a Comment