Trending

Monday, 15 July 2019

সবুজ গালিচায় মোড়া পাহাড়ের ঢাল হাতছানি দিয়ে ডাকে



দূরের পাহাড়, পাহাড়ের কোল বেয়ে চলা পাহাড়ি নদী । যেখানে পাহাড়ের গা সবুজ গালিচায় মোড়া , আর তার উপর সূর্যের প্রথম কিরণ  এসে পড়ে। এই দৃশ্যটা ভাবলেই মনটা কেমন যেন বেড়াই বেড়াই  করে তাই না। মনে হয় এক ছুটে গিয়ে সেই গালিচায় গড়িয়ে পড়ি। সূর্যের আলো গায়ে মেখে আবার নতুন করে নিজেকে চিনে নি।
আজকের পর্বে আমরা সেরকমই এক জায়গায় সন্ধানে যাব। সে স্থানটি খুব দূরে  নয়। দার্জিলিং থেকে সামান্য দূরত্বে অবস্থিত তাবাকোষি।



তাবাকোষি যেতে হলে আপনি নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে একটি অটো  বা গাড়ি নিয়ে শিলিগুড়ি জংশন চলে আসুন। এখান থেকে মিরিক যাবার শেয়ার গাড়ি পাওয়া যায়। আধার মিরিক  থেকে একটি গাড়ি নিয়ে চলে আসুন তাবাকোষি। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে তাবাকোষি আসতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘন্টা।এই তাবাকোষি নামের পিছনে একটি ইতিহাস আছে। জায়গাটির নাম প্রথমে ছিল গোপাল খাড়া। এই জায়গায় পাহাড়ের গা বেয়ে চা বাগানের মাঝখান দিয়ে একটি ছোট পাহাড়ি নদী বয়ে গেছে, যার নাম রঙ্গন খোলা। এই নদীটির নেপালি নাম হল তাম্বাকোশি। শোনা যায় বর্ষাকালে যখন বেশি বৃষ্টি হয় তখন এই নদীর জল কাদা জলে  গুলে গিয়ে তামাটে বর্ণ ধারণ করে। সেখান থেকে এই নদীর নাম হয়েছে তাম্বা। নেপালি ভাষায় কোশি শব্দের অর্থ হলো নদী। তাই তামাটে জলের এই নদী কে নেপালি ভাষায় তাম্বাকোশি বলে। সেই থেকে এ স্থানটির নাম হয় তাবাকোষি।



বেশিরভাগ চা বাগানে ঘেরা তাবাকোষি অতি মনোরম একটি স্থান ।এখানে বিশেষ কিছু পার্ক তৈরি করা হয়েছে যেখানে ইচ্ছে হলে আপনি তাঁবু খাটিয়ে রাত্রে বাস করতে পারবেন। বাগান ভিতরে খুব সুন্দর ভাবে সাজানো বসার জায়গা রয়েছে। এছাড়া রয়েছে অজস্র ফুলের বাগান। বাগান দেখতে দেখতে চলে আসতে পারেন নদীর কাছে। নদীতে বছরে অন্যান্য সময় খুব বেশি জল থাকে না ,কিন্তু বর্ষার সময় এই নদী অত্যন্ত খরস্রোতা হয়ে ওঠে । আপনার যদি ইচ্ছে হয় আপনি নদীতে স্নান করতে পারেন। নদীর পাশ থেকে অথবা ব্রিজের ওপর থেকে আপনি নদীর অপরূপ শোভা দর্শন করতে পারেন ।এই নদী এবং নদীর চারপাশের দৃশ্য  সত‍্যি ই অপূর্ব। ব্রিজের উপর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে চোখে পড়বে একটি নাগ মন্দির। পায়ে পায়ে এগিয়ে চলুন মন্দিরের কাছে। এই মন্দিরের সামনে স্থানটি বেশ প্রশস্ত। মন্দিরে বসে কিছুটা সময় অতিবাহিত করতে পারবেন। অপূর্ব প্রাকৃতিক শোভার মাঝে আধ্যাত্মিক পরিবেশ আপনার মনকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেবে।



রঙ্গনখোলা নদী এবং নাগ মন্দির দর্শনের পর হাতে যদি সময় না থাকে ফিরে যান হোটেলে। অবশ্য তাবাকোশি তে  রাতের সৌন্দর্য দেখার মত। পাহাড়ের গায়ে দূরে জনবসতির  লাইটগুলো জোনাকির মতো দেখতে লাগে। রাতের মায়াবী পরিবেশ না দেখলে আপনার মনে আক্ষেপ থেকে যেতেই পারে। আবার পরের দিন বেরিয়ে পরা গ্রামের অন্যদিক দেখার জন্য। ভোর বেলার মোরগের ডাক, ঘরে বানানো দার্জিলিং চা  এমনিতেই মনটা কে ফুরফুরে করে দেয়। এরপর বেরিয়ে পড়ুন গ্রাম দর্শনে। তাবাকোষির  আনাচে-কানাচে কমলালেবুর গাছ ছড়িয়ে রয়েছে। এখানে ভুট্টার ক্ষেত আপনি প্রায় দেখতে পাবেন। এছাড়া দেখতে পাবেন এলাচের বাগান, আদার ক্ষেত। শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্য নয় বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও আপনি এখানে দেখতে পাবেন ।পাখি আর প্রকৃতির মাঝখান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হয় তো পেয়ে যেতে পারেন ছোট্ট একটা পাহাড়ী ঝর্না কে। ঝরনার পাশে রয়েছে এলাচির বাগান। দৃশ্যটা মনে পড়লেই কেমন রোমাঞ্চ লাগে তাইনা? মনে হয় এক ছুটে চলে যাই।



চারপাশে যেদিকে দুচোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ ।যেন গোটা পৃথিবী টাকে কেউ সবুজ গালিচায় মুড়ে দিয়েছে। এমন গালিচা য় যেতে যেতে হঠাৎ একটি স্থানে নো হান্টিং সাইনবোর্ড দেখা গেল। জানা যায় সেখানে মাঝে মাঝে হরিণ চলে আসে। তাই এই সাইনবোর্ডের ব্যবস্থা।হাতে যদি সময় থাকে তাহলে তাবাকোশি থেকে তারজুম ঘুরে আসতে পারেন। স্থানটির সৌন্দর্য দেখার মত। সবুজ চা বাগানের মাঝখানে ফুটে থাকা রংবেরঙের ফুল ,ছোট্ট পাহাড়ি মন্দির পাহাড়ের গা বেয়ে এঁকেবেঁকে চলে রাস্তা কিছুক্ষণের জন্য কলকাতার কর্মব্যস্ততা, যান্ত্রিক জীবন যাপন কে ভুলিয়ে দেয়। তাবা কোশি থেকে তার জুম এর দূরত্ব মাত্র 30 মিনিট।



দার্জিলিং মিরিক এর মতন জনসমাগম এখনো হয়নি বলে তাবাকোশির নিরাভরণ সৌন্দর্য নিজের মতো করে বিকশিত হয়ে রয়েছে। তাই আমাদের যান্ত্রিক জীবন থেকে কিছু দিনের জন্য মুক্তি নিয়ে যদি প্রকৃতির মাঝখানে আমরা কিছুটা সময় কাটিয়ে আসি তাহলে সত্যিই আমাদের মন এবং শরীরের সজীবতা বাড়বে ।আবার নতুন করে চলার উদ্দম বাড়বে ।তাই হাতের কাছে ছুটি থাকলে একবার চট করে ঘুরে আসতে পারেন তাবাকোষি থেকে।

No comments:

Post a comment